বঙ্গবন্ধুময় লাল-সবুজের সুবর্ণজয়ন্তি

0
104
১৬ ডিসেম্বর। বাঙালির বিজয় দিবস। বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাহসী ডাকে সাড়া দিয়ে ৩০ লক্ষ শহীদ ও ২ লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে প্রাপ্ত স্বাধীনতা রক্তে কেনা অমর প্রাপ্তি। এবারের বিজয় দিবস অন্য সব বছরের চেয়ে ভিন্ন মাত্রার। আমরা এবার মুজিব বর্ষ পালন করছি। উদযাপন করছি স্বাধীনতা ও বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তি। এবারের বিজয় তথা বছরটা বঙ্গবন্ধুময়। আজকের এই দিনে সকলকে বিজয়ের প্রাণঢালা অভিনন্দন ও সশ্রদ্ধ সালাম।
বাঙালির স্বাধীনতা একদিনে বা একটি সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আসেনি। বাঙালি হিসেবে স্বাধীনতা ও বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তি উদযাপন করলেও বিজয়ের চূড়ান্ত স্বাদ পেতে আমাদের পূর্ব-পুরুষগণ শত শত বছর সংগ্রাম করে গেছেন। তাঁদের দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ফসল আজকের বিজয়। তবুও প্রশ্ন থেকে যায়, আমরা বৃটিশ ও পাকিস্তানি শাসকদের কাছ থেকে মুক্তি পেলেও স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ তথা সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার তথা সুশাসন ও পূর্ণ গণতন্ত্র এবং জনগণের সরকার পেয়েছি কী? বাংলার মানুষ মুক্ত মনে কথা বলা ও লেখার স্বাধীনতা কতটুকু পেয়েছে? প্রশ্ন থেকেই যায়! তবে উন্নয়ন ও অর্জন যে বহু তা দ্ব্যার্থহীন ভাষায় বলা যায়।
১৮৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে বাংলার স্বাধীনাতার সূর্য অস্তমিত হয়ে পরাধীনতার শৃঙ্খলে উপনিবেশিক শাসনে বন্দি হয়ে পড়ে ভরতীয় উপমহাদেশ তথা আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। শুরু হয় বাংলায় গভর্ণর শাসন। লর্ড ক্লাইভ বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশ শাসন করতে থাকে। এই বাংলাকে টর্চারসেল করে নীল চাষ শুরু করে বৃটিশরা। বাংলার মানুষ ব্যাপক স্বাধীনতা প্রবণ। শুরু হয় বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন। তীব্র আন্দোলনের মধ্যে বাংলার প্রভাবশালী নেতা সুভাষ চন্দ্র বসু গুম হয়। আজও তার সন্ধান পাওয়া যায়নি। ফাঁসি দেওয়া হয় অপ্রাপ্ত বয়স্ক ক্ষুদিরাম এর মত স্বাধীনতাকামী মানুষকে। কবি নজরুল ইসলাম, ইলা মিত্রের মত প্রথিতযশা মানুষেরা যুক্ত হয় বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে। আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। একপর্যায়ে ১৯৪৭ সালে বৃটিশরা এদেশ ছাড়তে বাধ্য হয়। কিন্তু পরিতাপের বিষয় বাংলা স্বাধীন হলো না। বাংলাকে দ্বিখন্ডিত করে পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তানের অন্তর্ভূক্ত করা হয়। শুরু হলো পাক উপনিবেশিক শাসন।
পাকিস্তানি শাসকরা এদেশের মানুষকে তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক মনে করতো। তারা বাংলাকে ব্যবসাক্ষেত্র মনে করতো। এদেশে উৎপাদিত ফসল, পাটজাত দ্রব্য, কাগজসহ বিভিন্ন পণ্য পাকিস্তানে যেতো। বাংলার মানুষের উৎপাদিত পণ্য নিয়ে প্রক্রিয়াকরণ শেষে আবার বেশি দামে এই বাংলায় বিক্রি হতো। বাংলার মানুষের খাদ্য, পণ্য, শিক্ষা, চাকুরির অধিকার হরণ করতো তৎকালীন পাকিস্তান সরকার। একনকি তারা বাংলা মায়ের মুখের ভাষা কেড়ে নিয়ে যাওয়ার চক্রান্ত শুরু করল। তৎকালীন ছাত্র সংগ্রামের কঠিন বাঁধার মুখে ১৯৫২সালে বীর শহীদের রক্তের বিনিময়ে বাংলা ভাষা রক্ষা পেলো। শুরু হলো বাংলার মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম। মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানসহ তৎকালীন নেতৃবৃন্দের সহসী নেতৃত্বে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের স্ব-অধিকার প্রতিষ্ঠা করাল লক্ষ্যে আন্দোলন শুরু করলেন।
এক পর্যায়ে তাদের নেতৃত্বে পেশাজীবী, শ্রমজীবী, কৃষক, মজুদ, সরকারী কর্মচারী, সেনাবাহিনী, পুলিশসহ সর্বস্তরের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হলো তার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন। মুজিবনগরে প্রবাসী সরকার গঠিত হলো। সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুশাসন তথা ন্যায় বিচারের ভিত্তিতে স্বাধীনতার ইশতিহার ঘোষিত হলো। তৎকালীন ছাত্রনেতা আ.স.ম. রবের নেতৃত্বে প্রথম জাতীয় পতাকা উত্তোলিত হলো। দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। বাংলার মানুষ ফিরে পেলো তাদের অধিকার। বাংলাদেশ নামক দেশটি বিশ্বের মানচিত্রে স্থান করে নব-উদ্যোমে যাত্রা শুরু করলো।
তবে মজার ব্যাপার হলো, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সমাজিক ন্যায়বিচারের দাবিতে স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হলেও সংবিধানে রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতি হিসেবে গৃহীত হলো- গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ। রচিত হলো সংবিধান। সুরক্ষা করা হলো মানুষের অধিকার। কিন্তু দেখা গেলো, তৎকালীন শাসক ও সেনা শাসকেরা গণতন্ত্রিক ভাবধারা উপেক্ষা করে জনগণের মতামত গ্রহণ না করে নিজের ইচ্ছায় দেশ চালানো শুরু করলেন। তারা বৃটিশ, পাকিস্তানের ভাবধারায় দেশকে শাসন করতে শুরু করলেন। জনগণের প্রতিনিধির কোন মূল্য থাকল না। গণতন্ত্রকে পদদলিত করে একদলীয় শাসন শুরু হল। বাংলার মানুষ আন্দোলন করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়লেও থেমে থাকেনি। ১৯৯০ সালে এরশাদের একদলীয় শাসনের বিরুদ্ধে বাংলার জনতা সংগ্রাম করে গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে সকল ধর্মের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করলো।
তারপর দীর্ঘ ত্রিশ বছর নির্বাচিত সরকার (২০০৭-’০৮ সালের অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যতীত) ক্ষমতায় থাকলেও জনগণের সরকার তথা জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠায় প্রায় সকলের দৃষ্টিভঙ্গি ও কার্যকলাপ অভিন্ন বলে মনে হয়েছে জনগণের কাছে।
আজকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তি পালনেও আমরা ভুলে গেছি বাংলাদেশ নামক স্বাধীন দেশটির গোড়াপত্তনে যাদের অবদান ছিলো, ত্যাগ ছিলো সীমাহীন, তাদেরকেও। আমরা ভুলে গেছি এই স্বাধীন ভূখন্ড প্রতিষ্ঠার জন্য মাস্টার দা সূর্যসেন, প্রীতিলতা, ক্ষুদিরাম বসু, শের-ই- বাংলা এ.কে. ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোরাওয়ার্দী, মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, তাজ উদ্দিন আহমেদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, মুক্তিযুদ্ধের সেনাপতি বঙ্গবীর জেনারেল আতাউল গণি ওসমানী ও সেক্টর কমা-ারদের কথা। ভুলে গেছি সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেন, ডা. জাফরুল্লাহ, আ.স.ম. রব, শাহজাহান সিরাজ, জীবন্ত কিংবদন্তি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী ও জাতীয় চার নেতাসহ জানা-অজানা শত সহ¯্র নেতা শত শত বছরের মুক্তি সংগ্রামের মাধ্যমে বিভিন্নভাবে অবদান রেখেছেন। তারই ধারাবাহিকতায় আজকের বাংলাদেশ। স্বাধীনতা ও বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তি। বিজয়ের সরকারি তথা জাতীয় উদযাপনে এই সকল মহান নেতাদের মূল্যায়ন কতটুকু?
বাংলাদেশের জনগণ সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়পরায়ণতার নিশ্চয়তা বিধানের জন্য বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন সার্বভৌম প্রজাতন্ত্ররূপে প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আত্মনিবেদন করে। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিলে ঘোষিত ঐতিহাসিক স্বাধীনতা সনদে তারই অনুরণন পরিস্ফুট।
বর্তমানে দেশের জাতীয় ঐক্যখ- ছিন্ন। কেউ কাউকে সহ্য করতে পারছি না। পরমতসহিষ্ণুতা ও পরস্পর শ্রদ্ধাবোধ হারিয়ে যাচ্ছে দিন দিন। আমাদের জাতীয় লক্ষ্যও অস্পষ্ট রয়েছে। সভ্যতা ও সংস্কৃতি আজ বিপন্ন। জাতীয় সংস্কৃতির প্রাণশক্তি আজ ক্ষয়িষ্ণু। জাতিসত্তার যে অমিত তেজ অসম্ভবের বিন্ধ্যাচল টলিয়ে দিতে সমর্থ হয়েছিল তা যেন চলৎশক্তিহীন, নিশ্চল। কেন এমন হলো? আমরা কেনো দিনকে দিন পরনির্ভরশীল হয়ে পড়ছি? পৃথিবীর বহু দেশ আজ আমাদের ওপর প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু কেনো?
বিজয়ের এই দিনে সবচেয়ে বেশি করে মনোযোগ দেয়া দরকার মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার সম্পর্কে। জাতীয় সঙ্কট থেকে উত্তরণে সবচেয়ে বেশি সহায়ক হতে পারে- আমাদের ইস্পাতকঠিন জাতীয় ঐক্য, নেতৃত্বের আত্মনির্ভরশীলতা এবং আত্মপ্রতিষ্ঠার অদম্য ও সুস্পষ্ট লক্ষ্য।
তবে, স্বাধীনতার অর্ধশত বছরে দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান যে উন্নত হয়েছে তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে জীবনযাত্রার প্রত্যাশিত মান অর্জন করা গেছে কি না এবং সর্বস্তরের মানুষের জীবনমানের উন্নতি হয়েছে কি না-সেটাই দেখার বিষয়। দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এ কৃতিত্ব বর্তমান সরকার ও কৃষিবিজ্ঞানীদের। তবে দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করলেও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা আজও সম্ভব হয়নি। ভেজাল খাবার খেয়ে প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে ক্যানসারসহ বিভিন্ন মরণব্যাধিতে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে সরকারকে আরও বেশি যতœশীল হতে হবে।দেশের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থার অবস্থা আরও করুণ। মান্ধাতা আমলের সিলেবাস দিয়ে চলছে পাঠদান। গবেষণা নেই, নেই কোনো সৃষ্টিশীলতা। স্বল্প গবেষণা হলেও অভিযোগ ওঠে নকলের। আবার চাকরির বাজারের সঙ্গে উচ্চশিক্ষা পদ্ধতির কোনো মিল নেই। কর্মসংস্থান একটি দেশের উন্নয়নের অন্যতম ধারক ও বাহক। বাংলাদেশে বেকারত্বের হার নিয়ে প্রায়ই ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়। সরকারি তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৭ লাখ। এর মধ্যে আবার ৪০ শতাংশ বেকার উচ্চশিক্ষিত। আর আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার মতে, বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি। ক্রমেই বাড়ছে এ সংখ্যা।

সার্বিকভাবে দেশের উন্নতি হয়েছে। তবে সমতাভিত্তিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। শহরকেন্দ্রিক উন্নয়নে ঝুঁকে পড়ার ফলে গ্রাম ও শহরের মধ্যে বিস্তর ফারাক সৃষ্টি হচ্ছে। দেশে বর্তমানে রাজনৈতিক অস্থিরতা নেই ঠিকই কিন্তু রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বেড়েছে খুন, সন্ত্রাস ও দুর্নীতি। দুর্নীতি দমন এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা সম্ভব হলে দেশ বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে-তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

বিলাল হোসেন মাহিনী
নির্বাহী সম্পাদক : ভৈরব সংস্কৃতি কেন্দ্র, যশোর।

bhmahini@gmail.com